সেবারে সেই শিমুলতলায়ে…

দেওঘর থেকে শিমুলতলা তিন ঘণ্টার ট্রেন, মা সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন একবার সেই ক্লাস সিক্সে, আর এখন যাচ্ছেন এই ২০১৬ তে। যথারীতি এবার দেওঘর গিয়ে একবার শিমুলতলা যেতেই হবে এবং মায়েরা আগেরবার যেখানে ছিলেন সেই জায়গাটা খুঁজে বার করতেই হবে, এটাই উদ্দেশ্য।

সে জায়গাটির নাম শৈলেন্দ্র ভবন..তা হলো ডাক্তার বাবুর বাগান বাড়ি। বাড়িটা নাকি ছিল খুুুব সুন্দর, তাতে একটা বড়ো কুয়ো ছিল। সে কুয়োর জল নাকি ভারি মিষ্টি আর তাতে দ্রূত খাদ্য হজম করাবার গূঢ় পদার্থ বিদ্যমান। বাড়ির আস পাশে ছিলো অনেক সুন্দর সবুজ গাছ। বড়ো বড়ো পাকা রাস্তা আর সে রাস্তা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত হেটে গেলেও ক্লান্তি বোধ হতো না। সে বাড়িতে একটি কেয়ারটেকার ছিল, নাম গোপী। ভারি ভালো মানুষ তবে খাদ্যরশিক বটে! দিদানের রান্না করা কচ্চপের মাংস এবং কচি পাঠার ঝোলের অর্ধ্যেকটা দুই থালা ভাত সমেত শেষ করে দিত এই গোপী। দুর্গা পুজো থেকে কালী পূজো পযন্ত যে লম্বা ছুটি তার ১০, ১৫ দিন ভাইবোনদের সাথে দারুন আনন্দে কেটে গিয়েছিল মায়ের, দাদু, দিদান ও দাদুর কলেজের প্রফেসর বন্ধুদের। মায়ের কাছে এমন সব গল্প শুনে যথারীতি শিমুলতলার কত সুন্দর ছবি মনে মনে এঁকে ফেললাম। ট্রেন চলছে আর আমার পৌঁছনোর অগ্রহও বাড়ছে।

ট্রেন থেকে নেমে দেখি ফাঁকা স্টেশন! দু একটি জনপ্রাণী মাত্র, তাও ট্রেন ছাড়ার সাথে সাথে তারা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। শিমুলতলা নেমে মায়ের কিছু মনে পড়ছেনা কোন দিকে যেতে হবে। কাজে দিক ঠাহর করতে না পেরে আমরা স্টেশন থেকে বা দিকের রাস্তাটি ধরে এগিয়ে চললাম। ফাঁকা রাস্তা তবে পাকা নয়! কাঁচা ও নয়! ইট বালি স্টোনচিপ ছড়ানো মেরামত আগ্রহী পথ। যা সবুজ মনে মনে কল্পনা করেছিলাম তা ঠিক না থাকলেও পাতা ঝরা গাছ গাছালি কিছু আছে এদিক ওদিক।

রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম আমরা। দূরে একটি লোক আসছে চোখে পড়লো। তিনি কাছাকাছি এসে পরলে, বাবা জিজ্ঞেসা করলেন, “দাদা, শৈলেনদ্র ভবন টা কোন দিকে বলতে পারেন?”
খানিক মাথা চুলকে লোকটি জবাব দিলেন, “আ শৈলেনদর ভবন? ভাইয়া উ সায়েদ ইধর সে পাস মে হ্যায়ে, চালিয়ে হাম অপকা লে চলতে হ্যায়ে!” লুঙ্গি পড়া সে ভদ্রলোক আমাদের নিয়ে গেলেন এক ভাঙাচড়া বাড়িতে, সেখানে renovation এর কাজ চলছে। বাড়ির compound এর একধারে ছোট ছোট ঘর করে কারা যেন বসবাস করছেন। এক মহিলা কয়লার উনুনে তা দিচ্ছেন। এক ছোট্ট মেয়ে অবাক নয়নে আমাদের পানে তাকিয়ে রইলো। মায়ের বাড়ি দেখে তবু কিছু মনে পরছে না..তিনি বললেন, “এমন তো ছিল না, এত দিনে কত কিছু পাল্টে গেছে!” লোকটিকে সাধলেন, “গোপী রেহতা হ্যায়ে ইধর?” জবাবে লোকটি উত্তর দিলো, “উ আপ পুচ্ছ লিজিয়ে মালিক সে।”

মালিক এক মাঝ বয়সী লোক। গোপীর নাম শুনে নিজেকে ওর মামা হিসেবে পরিচয় দিলেন। গোপী নাকি কলকাতায়ে গিয়েছে কাজে। অনেক গল্প হলো। সে গোবেচারা গোপীর এখন অনেক উন্নতি হয়েছে। শৈলেন্দ্র ভবন সে নিজেই কিনে নিয়েছে এবং কোন এক MLA এর মেয়েকে বিয়েও করেছে! গল্প এখানেই শেষ নয়, সে নাকি loan নিয়ে এক কোটি টাকার একটা ফাইভ স্টার হোটেল বানানোর প্লান করছে এই শিমুলতলাতে। মায়ের সাথে গোপীর ফোন এ কথা পর্যন্ত বলিয়ে দিলেন লেকটি! তবে মায়ের সব কথায়ে হা হু করে গেলেও কেবল মাত্র ফোনে কথা বলে আদৌ গোপীর মাকে অথবা সেই কচি পাঠার ঝোলকে মনে পড়েছিল কিনা বলা মুশকিল।

যাইহোক, অপেক্ষাকৃত অল্পবয়ষ্ক সেই মামাবাবু আমাদের গোটা বাড়ি ঘুড়ে দেখালেন। কোথায় কোন ঘর হবে সব বুঝিয়ে দিলেন। এখানে কোনো কুয়ো ছিল কিনা জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন কুয়োর উপর হয়ত এখন ঘর হয়ে গেছে, সে কুয়ো আর নেই। ক্রমশঃ বেলা বেড়ে গিয়েছে। খিদেও পেয়েছে। খাতির করে গোপীর মামাবাবু সেই ভদ্রলোক নিজের পছন্দের ফুটের ধারে একটি হোটেলে খেতে নিয়ে গেলেন আমাদের। আর অন্যান্য হোটেল এর অভাবে এবং খিদের পেটে আমরা ওই মোটা চালের ভাত, ডাল আর ঢেড়শ এর চিপস পরম তৃপ্তিতে আগ্রাসন করলাম। বিদায় নিয়ে দেওঘর ফিরলাম।

তারপর কলকাতায়ে ফিরে দিদান এর বাড়ী গিয়ে গল্পে মশগুল আমরা মায়ে ঝিয়ে, মায়ে ঝিয়ে। কথায় কথায় উঠে এলো শৈলেন্দ্র ভবন এর গল্প। দিদান সব শুনে মাকে বললেন, “স্টেশন থেকে বা দিকে নয়তো রে মালা, ডান দিক দিয়ে যেতে হয় শৈলেন্দ্র ভবন!”

Picture credits: Google images.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s